বেড়েছে সয়াবিন-পাম তেলের দাম

বিশেষ প্রতিনিধি

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, অনেক জায়গায় পাঁচ লিটারের বোতলজাত ভোজ্যতেলও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও আবার একজন ক্রেতাকে এক বোতলের বেশি তেল বিক্রি করা হচ্ছে না। খুচরা বাজারে ভোক্তাদের প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। স্বপ্ন ও মীনা বাজারের মতো চেইন শপগুলোতেও ভোজ্যতেলের মজুত সীমিত বলে জানানো হয়েছে এবং এক বোতলের বেশি বিক্রি করা হবে না বলে লেখা রয়েছে।

এক লিটার সয়াবিন তেলের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতলের এমআরপি ৯২০ থেকে ৯৫৫ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। গত ৭ ডিসেম্বর থেকে এই দাম কার্যকর রয়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের সর্বনিম্ন দাম ৩০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৯৫০ থেকে ৯৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৭ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ১৮৫ থেকে ১৯৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে খোলা পাম তেলের দামও লিটারপ্রতি ৬ থেকে ১৩ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১৬৩ থেকে ১৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করলেন। গতকাল সিলেট এলাকার কিছু বাজার ঘোরার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আপনি যে উদাহরণ দিলেন, তা সারা দেশের সাধারণ চিত্র নয়। সিলেটের প্রান্তিক এলাকায় আমি এমআরপি দরেই ভোজ্যতেল বিক্রি হতে দেখেছি। রোববার আমি চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি দেখতে যাব।’

দিলু রোডের একটি গলির এক পাশে চেইন শপ স্বপ্ন এবং অপর পাশে মীনা বাজার। দুটি দোকানেই গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নোটিশ টানানো রয়েছে—‘স্টক সীমিত। সকল গ্রাহকের সয়াবিন তেল কেনার অধিকার নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে প্রতি গ্রাহক সর্বোচ্চ এক পিস (বোতল) তেল কিনতে পারবেন।’ তবে এসব শপে এমআরপির চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রি করা হচ্ছে না। অন্যদিকে দিলু রোড থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে বিসমিল্লাহ ট্রেডিংয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এমআরপি অনুযায়ীই ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। তবে সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ফ্রেশ ব্র্যান্ড ছাড়া অন্য কোনো ভোজ্যতেল পাওয়া যাচ্ছে না। দোকানটির ম্যানেজার আবদুর রহমান বলেন, ‘রূপচাঁদাসহ সব কোম্পানির তেল চেয়েছি, কিন্তু কেউ দিতে পারছে না। ফ্রেশ ব্র্যান্ডের তেল পেয়েছি, সেটাই বিক্রি করছি।’

সরকারের পক্ষ থেকে ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পর্যালোচনা বৈঠক হয়েছে ৯ মার্চ। বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকেরাও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) ওই বৈঠকে ভোজ্যতেলের সরবরাহ ও দাম পরিস্থিতি নিয়ে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরে। এতে ভোজ্যতেলের সরবরাহ ঘাটতির কথা উল্লেখ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে বলে তাঁরা সরকারের কাছে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না।

বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে সাতটি পরিশোধন কারখানা ভোজ্যতেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এগুলো হলো মেঘনা গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, সিটি এডিবল অয়েল, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস, স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস এবং মীর বনস্পতি প্রোডাক্টস। সভায় আরও জানানো হয়, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের মোট মজুত রয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৯ টন। সাতটির মধ্যে চারটি কারখানা ৫৫ হাজার ৫০০ টন তেল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলেছে। এছাড়া চারটি কারখানার পাইপলাইনে রয়েছে আরও ১ লাখ ৫ হাজার ৩৫৩ টন ভোজ্যতেল। কারখানাগুলো প্রতিদিন গড়ে ৯ হাজার ৮৮ টন করে ভোজ্যতেল বাজারে সরবরাহ করছে। এ হিসাবে ৯ মার্চ পর্যন্ত গত ১৫ দিনে বাজারে মোট ৫৭ হাজার ৬৪৪ টন ভোজ্যতেল সরবরাহ করা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে শর্ষে ও রাইস ব্র্যান মিলে ভোজ্যতেল উৎপাদন হয় চার লাখ টন।ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে বলে তাঁরা সরকারের কাছে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁরা তেল সরবরাহ করছেন। বাজারে সংকট থাকার কথা নয়। তবে ভোজ্যতেলের আমদানি যথেষ্ট নয়।

২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে লিখিত জবাবে বলা হয়, প্রিভেন্টিভ টিম। পরিদর্শনের সময় কাঁচামাল পিরামিড আকারে থাকায় সঠিকভাবে পরিমাপ না করে অনুমান করে দুই হাজার ৫৬৫ মেট্রিক টন বেশি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে ছয়টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ১৪ হাজার ৫৭৭ মেট্রিক টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে। একই বছরের ১ ডিসেম্বর এক্স-বন্ড বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে প্রায় ১৯ কোটি টাকার শুল্ককর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। ৮ ডিসেম্বর বন্ড কমিশনারেট থেকে ছাড়পত্র (রিলিজ অর্ডার) নিয়ে কাঁচামাল অপসারণ শুরু হয়। এর মধ্যে প্রিভেন্টিভ টিম বন্ডেড ওয়‍্যারহাউজ পরিদর্শন করে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা দাবি করেন, পরিদর্শনের সময় অবৈধভাবে অপসারণের জন্য যে দুই হাজার ৫৬৫ মেট্রিক টন চিনি মজুদ রয়েছে, কিন্তু বন্ড রেজিস্টারে উল্লেখ নেই বলে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সঠিক নয়। মজুদ করা কাঁচামাল এক্স-বন্ডের মাধ্যমে ছাড় নেওয়া। এ প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে অপসারণের জন্য কখনও কাঁচামাল মজুদ করে না। শুনানিতে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা একই দাবি করেন। মজুদ কাঁচামাল আর বন্ড রেজিস্টার আড়াআড়িভাবে যাচাই করলে অতিরিক্ত মজুদ পাওয়া যাবে না বলেও দাবি করা হয়।