প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই এখন এই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এমনটা বলেন। আইনশৃঙ্খলার অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে সারাদেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তারকেও চিহ্নিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জুয়া এবং মাদকের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবরকমের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করছে। দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি নিয়মে। দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি অথবা জোর জবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’
রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায় এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কথা নয়। যদিও আমাদের অনেকের মধ্যেই এই মাসটিকে ঘিরে ব্যবসায় অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা লক্ষণীয়। আপনাদের প্রতি আমার আহবান, রামাদানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এই মাসটিকে আপনারা ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না। দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায় এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা সতর্ক থাকবেন।’
তারেক রহমান অনাচার ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে একটি মাফিয়া চক্রের পতন ঘটিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেন, বিএনপি সরকার দেশের সব খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী আরও আশ্বস্ত করেন যে, সরকার ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করবে। বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে এবং সবার স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণে সরকার প্রস্তুত বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই সরকার ক্রেতা-বিক্রেতা সবার সরকার। জনগণের ভোটে গঠিত এই সরকার জনগণের শক্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে।
রোজাদারদের সুবিধার্থে ইফতার, তারাবি ও সেহরির সময় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি অপচয় রোধে কৃচ্ছতা সাধনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘অফিস-আদালতে বিনা প্রয়োজনে বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি খরচের ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করাও ইবাদতের অংশ।’ সরকারি কর্মকর্তাদের কৃচ্ছতা সাধনের আহ্বান জানানোর আগে তিনি নিজের দলের এমপিদের দিয়েই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বলে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না।’
প্রধানমন্ত্রী রাজধানী ঢাকার যানজট ও জনদুর্ভোগ কমাতে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকরভাবে পুনর্গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মানুষ যেন নিজ নিজ জেলা বা নিজ বাসায় অবস্থান করেই সহজে অফিস-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই সারা দেশে রেল ব্যবস্থাকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় প্রথম ধাপে রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয়ের কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের ধারণা, সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজলভ্য ও নিরাপদ করা গেলে যেমন শহরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে, তেমনি পরিবেশ সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মেধায়, জ্ঞানে ও বিজ্ঞানে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য সবরকম সহযোগিতা দিতে বর্তমান সরকার প্রস্তুত। প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান এবং স্বচ্ছলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাদেরকে কোনো না কোনো একটি বিষয়ে বা কাজে পারদর্শী হতে হবে। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং তরুণ যুবশক্তির উদ্দেশে বলতে চাই, মেধায় জ্ঞানে বিজ্ঞানে নিজেদেরকে যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যতরকমের সহযোগিতা দেয়া যায়, সবরকমের সহযোগিতা দিতে বর্তমান সরকার প্রস্তুত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নবগঠিত সরকার গঠনের সুযোগ দিতে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বা দেননি, অথবা কাউকেই ভোট দেননি—এই সরকারের প্রতি আপনাদের সবার অধিকার সমান। দলমত, ধর্ম, দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, ‘আমরা আমাদের পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও আপনাদের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করি।’