পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার কৃষক মশিউর রহমান ধারদেনা করে ১৮ একর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছিলেন। প্রতি একরে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ভালো ফলনের কারণে তিনি আশা করেছিলেন, সব তরমুজ মিলিয়ে অন্তত ৩ কোটি টাকায় বিক্রি হবে। কিন্তু সেই আশায় ভরাডুবি নেমেছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হলেও বাকি তরমুজের জন্য মিলছে না ক্রেতা। যাঁরা আসছেন, তাঁরা দাম দিচ্ছেন অনেক কম। ফলে অধিকাংশ তরমুজ খেতেই পড়ে পচে যাচ্ছে। বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় এখন চরম বিপাকে পড়েছেন মশিউর রহমান; ঋণের বোঝায় পথে বসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে তার সামনে।
শুধু মশিউর রহমান নন, ক্রেতা সংকটে বরিশাল অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমির তরমুজ এখন খেতেই পচে যাচ্ছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অসংখ্য কৃষক। হিসাব বলছে, এ বছর উৎপাদিত তরমুজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বিক্রি হচ্ছে না, ফলে ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে একদিকে কিছু কৃষকের অপরিকল্পিত আবাদ, অন্যদিকে তরমুজ থেকে ক্রেতাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে, লাভ তো দূরের কথা—অনেক কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। যারা কিছুটা স্বচ্ছল, তারা হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন; কিন্তু ঋণ নিয়ে চাষ করা কৃষকদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি সংকটপূর্ণ। ঋণ কীভাবে শোধ করবেন—এই দুশ্চিন্তায় অনেকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে উৎপাদিত মোট তরমুজের শতকরা ৬৫ ভাগের জোগান দেয় বরিশাল বিভাগ। এখানকার উপকূলীয় ৬ জেলায় ফি বছরই হয় তরমুজের বাম্পার ফলন। গত বছর এই অঞ্চলের মোট ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ করেন কৃষকরা। ভালো ফলন আর লাভ বেশি হওয়ায় এ বছর আবাদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এর মধ্যে কেবল পটুয়াখালী জেলায়ই ৩৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে হয় তরমুজের চাষ। ১ এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে ৫৪ হাজার ৫৫১ হেক্টর জমির তরমুজ কেটেছেন কৃষকরা। ফলন মিলেছে ২০ লাখ ৫৫ হাজার ৬১ মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রশ্নে এই ফলন লাভজনক হলেও বিক্রি করতে গিয়ে পুড়ছে কৃষকের কপাল। আলোচ্য ফলনের এক-তৃতীয়াংশ তরমুজ এখনো পড়ে আছে কৃষকের খেতে। বিক্রি করার মতো ক্রেতা পাচ্ছেন না।
গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস এলাকার বাসিন্দা শফিকুর রহমান বলেন, এক একর জমিতে তরমুজের চাষ করতে গড়ে দেড় লাখ টাকা করে খরচ হয়। প্রতি একরে ফলন পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ১৫শ তরমুজ। হিসাব অনুযায়ী একেকটি তরমুজ উৎপাদনে ব্যয় হয় প্রায় ১০০ টাকা। বরিশাল কিংবা ঢাকার মোকামে পাঠাতে এর সঙ্গে পরিবহণ শ্রমিক, ট্রলার ভাড়া আর ওঠানো-নামানোর খরচ যোগ করলে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১৪০-১৫০ টাকায়। কিন্তু বর্তমানে আড়তদাররা ৯/১০ কেজি ওজনের একটি তরমুজের দাম ১৩০ টাকার বেশি দিচ্ছেন না। এতে তরমুজপ্রতি লোকসান দাঁড়াচ্ছে ১০/২০ টাকা। ১০ একর জমিতে যদি কেউ তরমুজ চাষ করে তবে তার লোকসান দাঁড়াচ্ছে সোয়া দুই লাখ টাকার বেশি। এর চেয়ে বড় কথা, লোকসানি এই দামেও তরমুজ নিতে চাচ্ছেন না শহরের পাইকাররা। ফলে বিক্রি করতে না পারায় খেতেই পচছে তরমুজ।
বরিশালের পাইকারি প্রতিষ্ঠান দত্ত বাণিজ্যালয়ের মালিক গনেশ দত্ত বলেন, ‘খুচরা বিক্রেতারা নিচ্ছে না তরমুজ। যে কারণে আমরাও পড়েছি বিপাকে। আড়তে যা আছে, তাই বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া এটি যেহেতু কাঁচামাল, তাই ঘরে রাখাও সম্ভব না। বেশি দিন হলেই পচে যায়।’ হঠাৎ বাজার পড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আসলে কমে গেছে। তাছাড়া ঈদে বিপুল খরচের পর এখন আর কেউ বিলাস পণ্য কিনছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দিকেই সবার ঝোঁক। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধেরও দায় রয়েছে এক্ষেত্রে। অজানা আশঙ্কায় অনেকে টাকা খরচ করছেন না। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিতে চলছে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কৃষকের কাছ থেকে স্ট্যান্ডার্ড সাইজের (৮-১০ কেজি) প্রতি পিস তরমুজ ১৩০/১৩৫ টাকায় কিনছি আমরা। প্রতি পিসে ৫ টাকা লাভ রেখে বিক্রি করছি খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। মাত্র দশদিন আগেও এই সাইজ ২৪০/২৫০ টাকায় কিনে একই লাভ রেখে বিক্রি করেছি। হঠাৎ বাজার পড়ে যাওয়ায় কমিয়ে দিতে হয়েছে দাম। তারপরও নিতে চাইছে না খুচরা বিক্রেতারা।’
বুধবার সকালে বরিশাল নগরী সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীতীরে গিয়ে চোখে পড়ে ঘাটে বাঁধা তরমুজবোঝাই বেশ কয়েকটি ট্রলার। পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসেছে সেগুলো। বিক্রির উদ্দেশ্যে এলেও আড়তদারদের কাছ থেকে মিলছে না সাড়া। পোর্ট রোডের আড়তদার জুয়েল তালুকদার বলেন, আড়তে জমে থাকা তরমুজই বেঁচতে পারছি না, নতুন করে কিনব কী করে? পটুয়াখালীর চর কাজল থেকে ট্রলারবোঝাই তরমুজ নিয়ে আসা কৃষক রুবেল মুন্সি বলেন, ৩৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে ১১ হাজার পিস তরমুজ এনেছি। খেত থেকে ট্রলারে ওঠাতে প্রতি পিসে ৫ টাকা করে দিতে হয়েছে শ্রমিকদের। এখানে নামাতে আবার দিতে হবে প্রতি পিসে ২ টাকা। সেই সঙ্গে রয়েছে চাষের খরচ। যে পরিস্থিতি, তরমুজ বিক্রি হবে কি না সন্দেহ। অন্তত খরচ যদি উঠত, তাহলেও বেঁচে যেতাম। আরেক আড়তদার বেল্লাল হোসেন বলেন, প্রতিদিনই ২-৩টা ট্রলার এভাবে আসছে তরমুজ নিয়ে। কেউ বিক্রি করতে পারছে, কেউ পারছে না। বরিশাল ঘাটে না পেরে অনেকে আবার তরমুজ নিয়ে ছুটছে ঢাকায়।
গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবুল মুন্সি বলেন, আমার ইউনিয়নে অনেক কৃষকের এখন পথে বসার জোগাড়। কেবল ধারদেনা নয়, অনেকে স্ত্রীর সোনা বন্ধক রেখে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তরমুজের চাষ করেছে। অকাল বৃষ্টি আর শিলা বর্ষণের কারণে এমনিতেই অনেকের তরমুজখেত নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি যা আছে, তা বিক্রি করা যাচ্ছে না ক্রেতার অভাবে। সরকারিভাবে এই কৃষকদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করা না হলে তারা চরম বিপদে পড়বে।
পটুয়াখালী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান স্নেহাংশু সরকার কুট্টি বলেন, বিপদগ্রস্ত কৃষকদের একটা তালিকা আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু করেছি আমরা। কৃষক যাতে বিপদে না পড়েন, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখবে সরকার।