ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পেশ ইমাম নিয়োগের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু ইমাম নিয়োগই নয়, খাদেম নিয়োগেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। একই ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রেও। বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম পদে মুফতি আহসান উল্লাহ ২০০৬ সালে আবেদন করেন। তার অভিযোগ, সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার পরও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে ন্যায়বিচার চেয়ে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। তিনি বলেন, তৎকালীন কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে দুর্নীতির মাধ্যমে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। আমি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েও বাদ পড়েছি।
মাওলানা মুফতি আহসান উল্লাহ বর্তমানে কাজ করছেন কাতারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মসজিদের পেশ ইমাম হিসেবে। পড়াশোনা করেছেন মিশরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৮ বছর হলো, চাকরি করছেন কাতারে। ভিনদেশের এমন সম্মান মুফতি আহসান উল্লাহর জন্য গর্বের হলেও, চাপা কষ্ট তাকে তাড়া করে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, রাষ্ট্রীয় মর্যাদারও প্রতীক। এই মসজিদের ইমাম পদটিও জাতীয় নেতৃত্বের স্বীকৃতি। সামাজিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ও ধর্মীয় জনমত গঠনে সক্ষমতাও রয়েছে জাতীয় ইমামদের। ফলে সিনিয়র সহকারী সচিব সমমানের এই পদ ঘিরে এতো আগ্রহ।
নথি পর্যালোচনায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও কারচুপির চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, মুফতি আহসান উল্লাহর পরিবর্তে পেশ ইমাম পদে নিয়োগ দেওয়া হয় মাওলানা মিজানুর রহমানকে, যিনি বর্তমানে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর এবং বয়স সংক্রান্ত জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নথি ঘেঁটে দেখা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ছয় দিন পর বয়স তিন বছর কমিয়ে ইমাম পদে আবেদন করেন মাওলানা মিজানুর রহমান। এছাড়া যেসব প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট কোর্সের জন্য কোনো নম্বর বরাদ্দ ছিল না, সেগুলোর জন্যও তাকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়। এমনকি নিয়োগ বোর্ডে তার এক নিকটাত্মীয় থাকার বিষয়টিও গোপন রাখা হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
মিজানুর রহমানের বিধিবহির্ভূত পদোন্নতির বিষয়টিও উঠে আসে একাধিক তদন্ত রিপোর্টে। বিধি লঙ্ঘন করে ১০ম গ্রেড থেকে তিনি সরাসরি বেতন তুলছেন ৫ম গ্রেডের। এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ থাকতেই পারে, এসব নিয়ে আমরা এখন আর কিছু বলতে চাই না’। নিয়োগ জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ দেখাতে চাইলেও বারবার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মিজানুর রহমান। একপর্যায়ে দরজা বন্ধ করে দেন তিনি। যদিও ২০ বছর ধরে সরকারি কোষাগার থেকে তুলছেন বেতন ভাতা।
তথ্য অনুযায়ী, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন ইমাম ও খাদেম নিয়োগে নিয়ম-নীতির যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। চাকরি পেতে জাল সার্টিফিকেট ও মিথ্যা অভিজ্ঞতা সনদ দাখিলের অভিযোগও উঠেছে। এমন অভিযোগ করেছেন মাওলানা মুফতি আব্দুল হাফিজ মারুফ, যিনি বর্তমানে রাজধানীর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদের সিনিয়র ইমাম। তিনি জানান, বায়তুল মোকাররম মসজিদের পেশ ইমাম পদে ২০১৫ সালে আবেদন করেছিলেন তিনি। লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও তাকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। তার দাবি, যাদের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতাই ছিল না, তাদেরই ডেকে পরে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নিজের খাতা পুনঃযাচাইয়ের জন্য আবেদন করেছিলেন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে কেউ নিয়োগ পেয়ে থাকলে তার জবাব একদিন আল্লাহর কাছেই দিতে হবে।
মুফতি আব্দুল হাফিজের জায়গায় বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম পদে নিয়োগ পান মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেম। তিনি সাবেক ধর্মমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহর ভাগ্নে। তার বিরুদ্ধে বয়স জালিয়াতি, স্বীকৃতিবিহীন সনদে নিয়োগসহ স্পর্শকাতর বেশকিছু অভিযোগ রয়েছে। চাকরির আবেদনে মুহিউদ্দিন কাসেমের দাখিল করা নথি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেখানে তার জন্মসাল দেখানো হয় ১৯৮৭; মাধ্যমিকের সনদে পাসের সাল ১৯৯৮। সেই হিসেবে, মাত্র ১১ বছর বয়সেই তিনি মাধ্যমিক পাস করেন। যেটি বয়স জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ। তার দাখিল করা এইচএসসি বা সমমানের সার্টিফিকেট ও মাকর্শিটেও রয়েছে ব্যাপক গড়মিল। সনদে মাদ্রাসার নাম জামিয়া রহমানিয়া; অথচ মাকর্শিটে দেয়া বায়তুল উলুম ঢালকানগর। সার্টিফিকেটে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৫০৩ আর মার্কশিটে লেখা ৪২১। একইভাবে সনদে পাসের সাল ২০০২, কিন্তু মার্কশিটে লেখা ২০০৪ সাল। বাবার নামেও রয়েছে গড়মিল। কথা বলতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
১০ম গ্রেডে নিয়োগ হলেও মুহিউদ্দীন কাসেম বেতন পাচ্ছেন ষষ্ঠ গ্রেডে। তার বিরুদ্ধে নৈতিক অধপতনের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগও রয়েছে। যে ঘটনায়, তিনি মুচলেকাও দিয়েছেন। মুফতি মহিউদ্দিন কাসেমের বয়স জালিয়াতির বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে নির্বাচন কমিশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে যোগাযোগ করা হয়। পাসপোর্ট অফিসের এই কাগজপত্র বলছে, মুহিউদ্দিন কাসেমির জন্ম ১৯৮১ সাল। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ৮ দিন আগে জন্ম তারিখ পরিবর্তন করে ১৯৮৭ সাল করেন। পেশ ইমাম পদে আবেদনের জন্যই বয়স ৬ বছর কমিয়ে অর্নূধ্ব-৩০ রাখেন মুহিউদ্দিন কাসেমি।
শুধু বায়তুল মোকাররমেই নয়, চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা মসজিদেও পেশ ইমাম ও খাদেম নিয়োগে জালিয়াতির তথ্য রয়েছে। সেখানে শুরুতে মাস্টাররোলে চাকরি পেয়েছিলেন আতাউর রহমান; তিনি কখনও ইমাম আবার কখনও মুয়াজ্জিনের ভুমিকায় কাজ করছেন। পেশ ইমাম পদে আবেদন করলেও চাকরি হয়নি। পরে নিয়োগ পান খাদেম পদে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, খাদেম পদের জন্য তিনি আবেদনই করেননি। বিষয়টি নিয়ে আতাউর রহমানের মুখোমুখি হলে তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে ইমাম পদের জন্য আবেদন করছি। আমি অন্য কোনো পদে আবেদন করিনি’। তাহলে কীভাবে তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি অফিসে যাচাই করতে বলেন।
পেশ ইমাম পদে আবেদনের সময় আতাউর রহমান দাওরায়ে হাদিসের একটি সার্টিফিকেট দাখিল করেন। সেই সনদ নিয়েও প্রশ্ন ছিল তার কাছে। জবাবে তিনি খুব বেশি কথা বলতে চাননি। অনুসন্ধান টিম যায় হাটহাজারীর সেই মাদ্রাসায়। যেখান থেকে দাওরায়ে পাস করেছেন বলে, দাবি আতাউর রহমানের। রেজিস্টার ঘেঁটে সার্টিফিকেটটি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করেন মাদ্রাসার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। কিন্তু সেই সার্টিফিকেটের সত্যতা পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধান বলছে, ঠিক ওই সময় থেকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ইমাম নিয়োগে অনিয়ম ও জালিয়াতির শুরু। তথ্য প্রমাণ থাকলেও কোনো সরকারের আমলেই নেওয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা।
আরেকজন মাওলানা এহছানুল হক। ২০১২ সালে বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। বছর খানেক আগে বদলি হয়েছেন চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা মসজিদে। ধর্মীয় বক্তা হিসেবে ওয়াজ-নসিহত করা ইহছানুল হক, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক মহাপরিচালক শামীম আফজালের ভাগ্নে। তার বিরুদ্ধে বিজ্ঞপ্তির শর্তবহির্ভূত সনদে চাকরি; মিথ্যা অভিজ্ঞতা সনদে নিয়োগসহ ৫টি অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি। ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো তাকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে বলে, মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে। এদিকে মাওলানা এহসানুল হকের বক্তব্য জানতে কর্মস্থলে না পেয়ে তার বাসায় গিয়ে যোগাযোগ করা হয়। তবে বাসার নিরাপত্তা কর্মী জানান, অনুমতি ছাড়া যেতে দিতে পারবেন না। এরপর মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা জানিয়ে বলেন, পরে যোগাযোগ করবেন। যদিও পরে আর যোগাযোগ করেননি মাওলানা এহসানুল হক।
চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা মসজিদের আরেক পেশ ইমাম মাওলানা আনোয়ারুল হক। প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা সনদ ছাড়াই নিয়োগসহ কয়েকটি অভিযোগ তার বিরুদ্ধেও। নিয়োগ সংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার নিয়োগের কার্যবিবরণীতে ধর্ম, অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং সিলেকশন কমিটির সদস্য-সচিবসহ নেই ৯ জনের স্বাক্ষর। আবেদনে উল্লেখ করা অভিজ্ঞতার সনদ দাখিল না করেই নিয়োগ পেয়ে যান আনোয়ারুল। গুরুতর এসব অনিয়ম-জালিয়াতির বিষয়ে কথা বলতে মাওলানা আনোয়ারুল হকের মুখোমুখি হন। কথাবার্তার একপর্যায়ে মারমুখি হয়ে উঠেন তার কয়েকজন অনুসারী।
এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন সেই সচিব রেজাউল করিমের সঙ্গে কথা বলা হয়, যিনি মাওলানা এহসানুল হক ও আনোয়ারুল হকের নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই নিয়োগ বৈধ ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মারুফকে সাক্ষাৎকার নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং তার মূল্যায়নে প্রার্থীরা যোগ্য ছিলেন না। কিন্তু তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) বিষয়টি আমলে না নিয়েই তাদের নিয়োগ দেন। এজন্যই তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করেননি। রেজাউল করিম আরও বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ধর্ম মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। এই তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছাড়া নিয়োগ বোর্ড পূর্ণাঙ্গ হয় না এবং সেই নিয়োগ বৈধ হিসেবে গণ্য হয় না।
মাওলানা এহসানুল হক এবং আনোয়ারুল হকের জালিয়াতির নিয়োগের বলি, বাগেরহাটের মাওলানা মুফতি ইলিয়াস হোসেন। বর্তমানে খুলনার একটি মসজিদে ইমামতি করছেন; পাশাপাশি একটি মাদ্রাসার পরিচালকও তিনি। পেশ ইমাম পদে প্রার্থীদের মধ্যে ইলিয়াস হোসেন ছিলেন সর্বোচ্চ নম্বরধারী; তবে কৌশলে মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করিয়ে, তাকে অনুত্তীর্ণ দেখানো হয়। চাকরি ফেরত পেতে তিনি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত আমি আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করি। বলি আল্লাহ তুমি আমার হক আমাকে ফেরত দাও। আর সেই হক ফেরত পাওয়ার জন্যই বিগত ২০১৮ সাল থেকে আমি দৌড় ঝাঁপ করছি’।
নীরিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের তদন্তে জালিয়াতির নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছিল। সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলেও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। সার্বিক বিষয়ে কথা হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আব্দুস ছালাম খানের সাথে। তিনি বলেন, ‘যাদের সনদ নাই, জাল জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা অ্যাকশনে যাবো’। জালিয়াতির ইমাম নিয়োগের ঘটনায় ৬ বছরে ৫টি তদন্ত কমিটি গঠন করে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন। তবে, প্রতিবেদন দিয়েছে মাত্র একটি কমিটি। এসব নিয়োগে তৎকালীন নিয়োগ বোর্ডের অনেকের দায় থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।