বায়ুদূষণ শুধুমাত্র শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায় না, এটি মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুকেও আরও প্রাণঘাতী করতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণের প্রভাব বিদ্যমান, সেখানে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি পরিবেশবিষয়ক জার্নাল ‘এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন’–এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন জাপানের ঐতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেন্টার ফর গ্লোবাল অ্যান্ড লোকাল ইনফেকশাস ডিজিজেসের ফুল ফ্যাকাল্টি সদস্য এবং বাংলাদেশি গবেষক ড. শাকিরুল খান।
ড. শাকিরুল খানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণ উচ্চমাত্রায় বিরাজ করছে, সেখানে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষণায় সূক্ষ্ম বায়ুকণা ও অন্যান্য দূষণ উপাদানের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে শক্তিশালী পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং ফুসফুস ও রক্তনালিতে প্রদাহ বৃদ্ধি পায়, ফলে ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুতে গড় মৃত্যুহার যেখানে মাত্র দশমিক ২০ শতাংশ, সেখানে বায়ু দূষণ বেশি হলে এই হার কয়েকগুণ বেড়ে যায়। যেসব দেশে সূক্ষ্ম বায়ুকণার মাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি, যেমন বাংলাদেশ, বুরকিনা ফাসো ও ইন্দোনেশিয়া, সেসব দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কম দূষণপ্রবণ দেশগুলোর যেমন ব্রাজিল, ইকুয়েডর ও কোস্টারিকার তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
গবেষণার নেতৃত্বদানকারী প্রধান লেখক ড. শাকিরুল খান বলেন, এটি প্রথম বৈশ্বিক গবেষণা, যেখানে প্রমাণ করা হয়েছে যে, বায়ুদূষণ ডেঙ্গুকে শুধু ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে না, বরং মৃত্যুঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। আমরা দেখেছি, দূষণপ্রবণ দেশগুলোতে ডেঙ্গু তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাণঘাতী। তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমরা এতদিন মূলত মশা নিয়ন্ত্রণের দিকেই গুরুত্ব দিয়েছি। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বায়ুদূষণ কমানোও ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে।
গবেষণার সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পিএম ২.৫ ডেঙ্গুতে মৃত্যুর একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী পূর্বাভাসকারী। বায়ুতে পিএম ২.৫ প্রতি একক বৃদ্ধিতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা এই ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ; মাথাপিছু আয় বেশি হলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। শুষ্ক মৌসুমে যখন পিএম ২.৫-এর মাত্রা গড়ে ১২৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে পৌঁছায়, তখন ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ০.৮২ শতাংশে দাঁড়ায়। বর্ষা মৌসুমে তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার বাতাসে এই হার কমে ০.৪৫ শতাংশে নেমে আসে। বিপরীতে, ব্রাজিলের মতো দেশে বায়ুদূষণ কম থাকায় ডেঙ্গু মৃত্যুহারে মৌসুমি ওঠানামা খুব সীমিত।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও বায়ু দূষণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই গবেষণার বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু স্বাস্থ্য খাত নয়, পরিবেশ সুরক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণকে একসঙ্গে বিবেচনায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাই জোরালোভাবে তুলে ধরেছে এই গবেষণা। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য নীতিতে নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দিয়েছে।